মার্কেটিং প্লান কি? কিভাবে মার্কেটিং করবেন

মার্কেটিং শব্দটির সাথে আমরা মোটামুটি সবাই পরিচিত। আমাদের এই ছোট দেশে ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে যাদের সবারই কোনো না কোনো মার্কেটিং পলিসি আছে । ব্যবসায়ীদের জন্যে মার্কেটিং হলো লোকেদেরকে নিজ ব্রান্ডের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলা এবং গ্রাহকে পরিনত করার উপায়। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যবসার ময়দানে টিকে থাকা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। এ জন্যে আপনাকে ক্রমাগত নিত্য নতুন মার্কেটিং কৌশল বের করতে হবে যেগুলো আকর্ষনীয় ও কার্যকর হবে। আজকের আর্টিকেলে আমরা মার্কেটিং প্লান নিয়েই আলোচনা করব।

মার্কেটিং কি?

মার্কেটিং হলো একটি ব্যবসা বা ব্রান্ডের পণ্য বা পরিষেবাগুলোকে টার্গেট অডিয়েন্সের নিকট প্রচার করার প্রক্রিয়া। মার্কেটিং কে বাংলায় বিপণন বলা হয়। যদিও বিপণন এর চেয়ে আমরা মার্কেটিং শব্দটির সাথেই বেশি পরিচিত। মার্কেটিং ফোকাস করে নির্দিষ্ট কাস্টমারদেরকে যারা নির্ধারিত পণ্যের প্রতি আগ্রহী । নিয়মিত বাজার বিশ্লেষন ও নতুন নতুন কৌশল তৈরি করাও মার্কেটিং এর অন্যতম অংশ। তাই বলা যায়, মার্কেটিং হলো আপনার ব্যবসা ও কাস্টমারের মধ্যে সংযোগ তৈরি করার প্রধান হাতিয়ার। বিজ্ঞাপন, প্রচার প্রচারনা, কাস্টমার সাফোর্ট, পণ্যের ডেলিভারি পর্যন্ত মার্কেটিং এর সাথে যুক্ত। 

মার্কেটিং এর গুরুত্ব

যেকোনো ব্যবসার সফলতার পেছনে যেমন সঠিক মার্কেটিং স্ট্রাটেজি রয়েছে তেমনি ব্যবসা ব্যর্থ হবার কারনও কিন্তু ভুল মার্কেটিং পলিসি। আপনার পণ্য যত ভালোই হোক না কেন তা যদি নির্ধারিত লোকেদের নিকট আপনি পৌছাতেই না পারেন তবে তা সফলতার মুখ দেখবে না এটাই স্বাভাবিক। অপরদিকে আপনি যদি সফলভাবে আপনার পণ্য সম্পর্কে লোকেদের মেসেজ দিতে পারেন তাহলে সেখান থেকে নিশ্চিতভাবেই আপনার গ্রাহক তৈরি হবে। মার্কেটিং আপনাকে আপনার ব্রান্ডের মিশন ভিশনকে সবার সাথে শেয়ার করার সুযোগ দেয়। মার্কেটিং এর ফলে  আগত গ্রাহক অন্যদেরও আপনার পন্যের প্রতি অনুপ্রানিত করে।  

মার্কেটিং প্লান কি?

মার্কেটিং প্লান হলো একটি পরিকল্পিত নথি যাতে একটি নির্দিষ্ট ক্যাম্পেইনকে কেন্দ্র করে মার্কেটিং স্ট্রাটেজিগুলো তৈরি করা থাকে। এটি ত্রৈমাসিক কিংবা অর্থবছরের হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে তৈরি হয় যা যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। এতে কোম্পানির লক্ষ্য, সম্পদ এবং প্রচার প্রচারনা সফল করার লক্ষ্যে স্টেপ বাই স্টেপ নির্দেশনা থাকে। কোম্পানির মার্কেটিং ও ডেভেলপিং ডিপার্টমেন্টের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এসব স্ট্রাটেজি তৈরি করা হয়।

মার্কেটিং প্লান ও মার্কেটিং স্ট্রাটেজি

মার্কেটিং প্লান ও মার্কেটিং স্ট্রাটেজি একই জিনিস নয়। অনেকগুলো মার্কেটিং স্ট্রাটেজির মাধ্যমে একটি সুপরিকল্পিত মার্কেটিং প্লান সাজানো হয়। পণ্য, লক্ষ্য ও শিল্প ব্যবস্থাপনার উপর ভিত্তি করে স্ট্রাটেজি পরিবর্তিত হয়। আপনি যদি অনলাইনে আপনার ব্র্যান্ড ভেল্যু বাড়াতে চান তাহলে আপনাকে কন্টেন্ট মার্কেটিং ও সোস্যাল মিডিয়ায় বেশি নজর দিতে হবে।

মার্কেটিং প্লানে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে

মার্কেটিং প্লান কতগুলো বিষয় একত্রিত করে গড়ে উঠে। যার প্রত্যেকটি ব্যবসার জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

মার্কেটিং স্ট্রাটেজি

মার্কেটিং প্লান বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপ-ই হলো মার্কেটিং স্ট্রাটেজি। 

মার্কেটিং প্লানের ভিত্তি হলো মার্কেটিং স্ট্রাটেজি। এটিকে মার্কেটিং এর ভিত্তি বলার কারন হলো এটি আপনার কোম্পানির পণ্য, সেবা, লক্ষ্যকে চারিদিকে, দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দেয়। মার্কেটিং স্ট্রাটেজিগুলো হলোঃ 

১ সোস্যাল মিডিয়া মার্কেটিং

২ সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন

৩ কন্টেন্ট মার্কেটিং

৪ পে পার ক্লিক এডভার্টাইজিং

৫ পাব্লিক রিলেশন

৬ ই-মেইল মার্কেটিং

মার্কেট রিসার্চ

মার্কেট রিসার্চ ব্যবসার প্রধান একটি স্ট্রাটেজি। আপনার পণ্যটি কোন কোন এরিয়ায় ভালো সেল হচ্ছে, আপনার প্রোডাক্টের সেইম প্রোডাক্ট বাজারে কতগুলো আছে, আপনার মূল কম্পিটিটর কারা, চলমান সেল কি রকম, বাজারে আপনার পণ্যের সাথে কোন কোম্পানির পণ্যের প্রতিযোগীতা বেশি হচ্ছে এবং তাদের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপগুলো, চাহিদা ও সরবরাহ মোটামুটি এই বিষয়গুলো মার্কেট রিসার্চ এর অন্তর্ভুক্ত। সঠিকভাবে মার্কেট রিসার্চ করতে ব্যর্থ হলে আপনার প্রতিযোগীরা বাজার দখল করে ফেলবে ফলে আপনার ব্যবসার বারোটা বাজবে। আবার যদি খুব দক্ষতার সাথে মার্কেট রিসার্চ করা হয় তাহলে আপনি বাজারের অবস্থা বুঝে যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন এবং লোকসানের হাত থেকে বেচে যাবেন। 

পণ্য বা পরিষেবা

আপনার পণ্য বা পরিষেবাগুলোকে সুন্দর করে মানুষের সামনে তুলে ধরুন। কেন আপনার পণ্যটি বাজারে অন্যগুলো থেকে সেরা, কেন এটির প্রয়োজন তার শ্রুতিমধুর ও পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিন। মানুষের সাথে ইন্টারেকশন করুন আপনার পণ্য নিয়ে । চেষ্টা করুন তাদের প্রশ্ন গুলোর উত্তর করার। এতে মানুষ আস্থা পাবে।

ব্রান্ডিং

ব্রান্ডিং কে বলা হয় মার্কেটিং স্ট্রাটেজির ফাউন্ডেশন। ব্যবসায় ব্রান্ডিং এর গুরুত্ব অনেক। ব্রান্ড আপনার ব্যবসা বা সেবাকে সবার থেকে আলাদা স্বতন্ত্র রূপ দিবে। ব্রান্ডিং এর কাজ হলো ব্যবসাকে অনন্যতা দেয়া, যাতে এটি অন্য কারো সাথে সাদৃশ্য না থাকে। যেমন আপনি একটা লোগো দেখেই বুঝে নেন এটি কোন ব্রান্ডের পণ্য । লোগো হলো ব্রান্ডিং এর অংশ। প্রতিটা কোম্পানির আলাদা আলাদা লোগো থাকে। বেশির ভাগ কোম্পানি ব্রান্ডের উপর ভিত্তি করেই মার্কেটিং প্লান তৈরি করে। কারন মার্কেটিং এর সফলতা ব্রান্ডিং এর উপর নির্ভর করে। তাই একটু সময় লাগলেও একটি শক্তিশালী ব্রান্ড তৈরি করা উচিৎ কারন এটি আপনার ব্যবসায়িক মুনাফা কয়েকগুন বৃদ্ধি করবে ও মার্কেটে আপনার দৃঢ় অবস্থান তৈরি হবে। ব্রান্ডিং নিয়ে যখন কথা এসেছে তখন ব্রান্ডিং এর কিছু উপাদান নিয়ে কথা বলা যাক।

ব্রান্ড নেইমঃ একটি ইউনিক ও আকর্ষনীয় ব্রান্ড নেইম নির্ধারন করুন যা সহজেই উচ্চারন করা করা যাবে এবং অর্থবহ হবে । যদিও  amazon শব্দের সাথে Amazon এর ব্যবসার কোন সম্পর্ক নেই,  কিন্তু এই নামটি অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ।

লোগোঃ একটি ইউনিক লোগো আপনার ব্র্যান্ডকে বাজারে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করবে এবং আপনার ব্রান্ড ভেল্যু বাড়াবে।

ভিজ্যুয়াল ব্র্যান্ড উপাদান: এর মধ্যে থাকবে আপনার ব্র্যান্ডের রঙ, ফন্ট, গ্রাফিক্স এবং অন্য যেকোনো ভিজ্যুয়াল উপাদান । কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারলে আপনার ব্রান্ডের একটি সাধারণ চিত্রও একটি আইকন হয়ে উঠতে পারে। এবং তা আপনার ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করবে।

ট্যাগলাইন, স্লোগান: আপনার টার্গেট অডিয়েন্স বা আপনার পণ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি ট্যাগলাইন তৈরি করুন। এটি আপনার ব্রান্ডের ভাষা ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে। কলার টিউন তৈরি করতে পারেন নিজ ব্রান্ডের।

ধারাবাহিকতাঃ আপনার ব্রান্ড ভয়েস ছড়িয়ে দিতে অবশ্যই কাজের ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। কিছুদিন পর পর স্ট্রাটেজি পরিবর্তন করা ব্রান্ডের স্ট্যাবিলিটি কমিয়ে দেয়। 

ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং

মার্কেটিং কে অনেক ভাগে ভাগ করা গেলেও বেশির ভাগ লেখক মূলত দুই ভাগে এটিকে ভাগ করেন যার একটি ট্রাডিশনাল বা গতানুগতিক মার্কেটিং অপরটি ডিজিটাল মার্কেটিং। বর্তমানে যদিও ডিজিটাল মার্কেটিং এর জনপ্রিয়তা অনেক বেশি । এটি সাশ্রয়ী ও সহজ তবুও প্রচলিত ধারার মার্কেটিং এখনও বেশ ভালোভাবেই চলছে। ইন্টারনেট আসার পূর্বে যেভাবে মার্কেটিং করা হতো সেটাই ট্রাডিশনাল মার্কেটিং। ব্যানার,বিলবোর্ড, লিফলেট এর মাধ্যমে করা বিজ্ঞাপন গুলো এর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া এক সময় ফেরিওয়ালারা পণ্য নিয়ে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করতো এসব-ই গতানুগতিক মার্কেটিং। এখন যদিও অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি চলে এসছে তবুও এই গতানুগতিক মার্কেটিং কিন্তু হারিয়ে যায়নি। প্রচারনা কার্যক্রম চালানোর লক্ষ্যে কিছু উপকরনঃ

বিজনেস কার্ডঃ বিজনেস কার্ড আপনার ব্যবসাকে অধিক প্রোফেশনাল লুক দেবে। আপনি খুব সহজেই যে কাউকে বিজনেস কার্ড দিতে পারেন। এতে প্রচারনাও হবে সাথে প্রফেশনালিজমও প্রকাশ পাবে। 

পোস্টকার্ড, প্যামফলেট, লিফলেটঃ বিজনেস কার্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন জনবহুল স্থানে আপনার কোম্পানির লিফলেট বিতরন করতে পারেন। শুরুর দিকের বিজনেসের জন্যে এটি ভালো কাজে দেয়। এছাড়া  মানুষের অধিক চলাচলের স্থান যেমন ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ে তে বিলবোর্ড স্থাপন করে মানুষের নজরে আসা যায়।

ব্রাউচারঃ ব্রাউচার আপনার ব্যবসার উপর নির্ভর করে তৈরি হবে। এটি একটি ব্রান্ডের গল্প ও ইতিহাস তুলে ধরে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন লোভনীয় অফার দেয়া হয় যাতে ব্রান্ড অধিক পরিচিতি পায়।

ডিজিটাল মার্কেটিং

পুরো বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও গত কয়েক বছর থেকে ব্যবসার মার্কেটিং সেক্টিরটি অনলাইনমূখী হয়েছে। মূলত ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন মিডিয়া ব্যবহার করে যে ধরনের মার্কেটিং করা হয় তাই হলো ডিজিটাল মার্কেটিং। ডিজিটাল মার্কেটিং কে একটি ছাতার মতো চিন্তা করা যায়, যার ভেতরে সব ধরনের ইলেকট্রনিক মার্কেটিং থাকে। ওয়েবসাইট, সোস্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, এসইও, কন্টেন্ট মার্কেটিং, টিভি ও রেডিও বিজ্ঞাপন সব গুলোই ডিজিটাল মার্কেটিং এর অংশ। ডিজিটাল মার্কেটিং এর মাধ্যমে কম খরচ ও স্বল্প সময়ে অধিক কাঙ্ক্ষিত গ্রাহক পাওয়া যায়। 

ওয়েবসাইটঃ  যেকোনো বিশ্বস্ত ব্রান্ডের এখন ওয়েবসাইট থাকা অত্যাবশ্যক। একটি সুন্দর, সুগঠিত, ইউজার ফ্রেন্ডলি ওয়েবসাইট আপনার ব্রান্ডের বিশ্বস্ততা বাড়াবে। অপরপক্ষে অপরিকল্পিত ও দুর্ভেদ্য ওয়েবসাইট ব্রান্ডের ভেল্যু নষ্ট করবে। গ্রাহক আস্থা হারাবে। তাই আপনি ব্যবসায়ী হলে আপনার অবশ্যই একটি উচ্চ গুনগতমানসম্পন্ন ওয়েবসাইট থাকতে হবে।

সোস্যাল মিডিয়া মার্কেটিংঃ বর্তমান পৃথীবিতে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সবচেয়ে কম সময়ে এই মাধ্যম থেকে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক পাওয়া যায়। তাই আপনাকে ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ সবগুলো সোস্যাল সাইটে গুরুত্বের সাথে কাজ করে একটি অবস্থান তৈরি করে নিতে হবে। 

এসইওঃ এসইও ডিজিটাল মার্কেটিং এর অন্যতম শাখা। এটি ছাড়া ডিজিটাল মার্কেটিং কল্পনাও করা যায় না। সঠিকভাবে আপনার কন্টেন্ট, পণ্য, পরিষেবার এসইও করলে তা মানুষের কাছে সহজলভ্য হবে। এসইও না করলে গুগলে আপনার প্রোডাক্ট র‍্যাংক করবে না। ফলে কম্পিটিটর যারা থাকবেন তারা আপনার থেকে অনেক বেশি এগিয়ে থাকবে। 

সর্বোপরি, মার্কেটিং হলো ব্যবসার প্রান। তাইতো সব বড় বড় সুনামধন্য কোম্পানি শুধু প্রচার প্রচারনার পেছনেই কোটি কোটি টাকা খরচ করে তাদের ব্রান্ড ভেল্যু ধরে রাখে ও দিন দিন উন্নতি করে। তবে এই মার্কেটিং কার্যক্রম আপনি পরিকল্পিত ও সময় উপযোগী করতে ব্যর্থ হলে সমগ্র ব্যবসা হুমকির মুখে পড়বে। তাই অবশ্যই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মার্কেটিং প্লান করে ব্যবসায় নামা উচিৎ।

4728dbbc5c6763f37c33f5ebb100ad9e?s=150&d=mm&r=g

Tanvir Brain

 themarketerbd@gmail.com  https://www.monsterbangla.com

We will be happy to hear your oughts

Leave a reply

Monster Bangla
Logo
Compare items
  • Total (0)
Compare
Shopping cart