কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসা করার নিয়ম

কুরিয়ার সার্ভিস বর্তমান সময়ের খুবই লাভজনক ব্যবসাগুলোর মধ্যে একটি। আমাদের দেশে ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে কুরিয়ার সার্ভিসের জনপ্রিয়তা ব্যাপক বেড়েছে। এক সময় দেশে হাতে গোনা কয়টা কুরিয়ার সার্ভিস থাকলেও এখন দেশব্যাপী, বিভাগীয় শহর কিংবা অঞ্চল ভিত্তিক অনেকগুলো কুরিয়ার সার্ভিস এসেছে । এসব কুরিয়ার সার্ভিসের কোনোটিই গ্রাহক অভাবে ভুগছে এমন দেখা যায় না। কারন মানুষের সময় সংক্ষিপ্ত হয়েছে, ব্যস্ততা বেড়েছে তাই এখন মানুষ তার প্রয়োজনীয় সব সেবাই দ্রুত পেতে চায়। আর কুরিয়ার সার্ভিস এক্ষেত্রে মানুষের জিনিসপত্র দ্রুত গন্তব্যে পৌছে দিয়ে মানুষকে সাহায্য করে। 

কুরিয়ার সার্ভিস বা পণ্যপরিবহন সেবার ব্যবসা করতে হলে এখন অনেক বেশি টাকার প্রয়োজন হয় না। আপনি চাইলে আপনার বাজেটের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট এরিয়ায় সার্ভিস দিতে পারেন। সার্ভিসের উপর নির্ভর করবে আপনার ব্যবসা কতটা গ্রো করবে। কারন অনেকেই কুরিয়ার ব্যবসা দিয়ে সফল হতে পারলেও দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক ভোগান্তির কারনে ব্যর্থ হওয়ার সংখ্যাও কম নয়।

বাংলাদেশে কুরিয়ার সার্ভিসের বর্তমান পরিবেশ

বাংলাদেশে কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসা একটি স্ট্যাবল ব্যবসা। কারন আমাদের দেশ অধিক জনসংখ্যার দেশ। এ বিশাল জনসংখ্যার অনুপাতে যে পরিমান কুরিয়ার সার্ভিস থাকার কথা তা কিন্তু এখনও নেই। যারা আছে তাদের হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির সেবা সন্তোষজনক। বাকিদের সার্ভিস নিয়ে অনেকেরই অভিযোগ আছে। আপনার কুরিয়ারে নিয়মিত যাতায়াত থাকলে সেটা নিজেই বুঝবেন। বিশেষ করে যারা অনলাইনে বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করেন তারা এ বিষয়টি ভালোই জানেন। 

করোনাকালীন আমাদের দেশের প্রায় সবগুলো ব্যবসায়িক খাত লোকসানের মুখে পড়লেও কেবল কুরিয়ার কোম্পানি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি লাভ করেছে। যেহেতু এ সময় বাইরে যাওয়া সবার জন্যে নিয়ন্ত্রিত ছিলো তাই জরুরী প্রয়োজনে সব পণ্যই কুরিয়ারের মাধ্যমে আনতে হয়েছে। যারা করোনাকালীন দেশে কুরিয়ার সেবা দিয়েছেন তারা এই সময়টাতে ভালো একটা রেভিনিউ অর্জন করতে পেরেছেন। শুধু করোনার মধ্যেও অনেকে কোম্পানী খুলে সার্ভিস দিয়েছেন। কুরিয়ার কোম্পানীগুলোর সংগঠন সিএসএবি’ র মতে বর্তমান বাংলাদেশে কুরিয়ার কোম্পানির সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। তবে সবাই তাদের সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার এ প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগের-ই লাইসেন্স করা নেই। সরকারী হিসাব অনুযায়ী মাত্র ৭২টি কোম্পানির লাইসেন্স আছে। দেশে এখন অভ্যন্তরীন কুরিয়ার গুলোর মধ্যে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস, পদ্মা কুরিয়ার সার্ভিস, কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিস, করতোয়া কুরিয়ার সার্ভিস ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রায় ৪০টি কুরিয়ার আমাদের দেশে কাজ করে যারা বিদেশে থেকে পণ্য আনা নেওয়া করে। 

অনলাইন কুরিয়ার

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের পাশাপাশি দেশে অনেকগুলো অনলাইন কুরিয়ার সার্ভিস রয়েছে। মূলত ২০১৬ সাল থেকে এই কুরিয়ার সার্ভিসটি আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ঢাকার শহরসহ প্রধান শহরগুলোতে এই সার্ভিসটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। অল্প টাকায় এই সার্ভিস শুরু করা যায়। ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকে এই ব্যবসা শুরু করে এখন তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। ই কমার্স ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বেশি সেবা দিয়ে থাকে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান। বেশিরভাগ তরুনরা এই সার্ভিসটি দিয়ে থাকে। অনলাইন কুরিয়ার সার্ভিস শহরের অভ্যন্তরীন হওয়াতে তারা মার্চেন্ট এর শহরের বাইরের পণ্যগুলো বড় কুরিয়ার কোম্পানীগুলোর মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে মার্চেন্ট মূল খরচের বেশি অর্থ দিয়ে থাকে অনলাইন কুরিয়ারকে যেহেতু তারা পণ্যটি সুন্দরবন বা এস এ পরিবহনের মতো বড় কুরিয়ারে পরিবহন করে নিয়ে যায়। 

কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসা কেন করবেন?  

কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসা এই জন্যে করবেন যে, এটা আমাদের দেশে এখন খুবই জনপ্রিয় ও লাভজনক একটি ব্যবসা। বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি এখন নিত্যদিনের পণ্যও মানুষ অনলাইনে অর্ডার করে দেয়। আর কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানি সেগুলো বাসায় দিয়ে যায়। নিত্য দিনের পণ্য যেহেতু প্রতিদিন-ই প্রয়োজন হয় তাই আপনিও ব্যবসা করলে এই গ্রাহকদের পেতে পারেন। আর কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসার ভবিষ্যত যে কোনো হুমকির মুখে নেই বা ভবিষ্যতেও আপনি এই ব্যবসা করে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন এরকম কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে আপনাকে অবশ্যই আশানুরুপ সার্ভিস দিতে হবে। এই আশানুরুপ সার্ভিস দিতে আপনার কি কি করতে হবে আমরা এখন এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব। 

কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসার আইডিয়া

কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসা শুরু করার আগে আপনি প্রয়োজনীয় কিছু প্লান করে নেওয়া জরুরী । পরবর্তীতে সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে গেলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তবে অবশ্যই একজন ব্যবসায়ীকে পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী যেকোনো সিদ্বান্ত ভেবেচিন্তে নিতে হবে। পরিকল্পনার কোনো অংশ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই বাদ দিতে হবে। আর সাথে আপডেট সব বিষয়ের সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে। 

ব্যবসার প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস

আপনিই যে ব্যবসাই করেন না কেন তা সরকারীভাবে বৈধকরন করতে হলে অবশ্যই লাইসেন্স করতে হবে। লাইসেন্স থাকলে আপনার প্রতিষ্ঠান অধিক বিশ্বাসযোগ্য হবে। সরকারী খাতায় নাম নেই এমন প্রতিষ্ঠানের সাথে নিশ্চয়ই সচেতনরা কাজ করতে আগ্রহী হবেন না। তাই আপনাকে ট্রেড লাইসেন্স করে নিতে হবে এবং এর সাথে টিন সার্টিফিকেটসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্টস সংগ্রহ করতে হবে। কাগজ পত্র ছাড়া কুরিয়ার ব্যবসা করলে কেউ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তাতক্ষনিক তা সরকার বন্ধ করে দিবে। আপনি আর চাইলেও তা পুনরায় চালু করতে পারবেন না। আর আপনার প্রতিষ্ঠানের সরকারী কাগজপত্র থাকলে আপনি যেকোনো বিষয়ে আইনের সাহায্য নিতে পারবেন । কোনো সাজা দিলে তা আপিল করতে পারবেন। তাই যদি আপনার একটি স্থায়ী কুরিয়ার ব্যবসা করার ইচ্ছে থাকে, তবে অবশ্যই ব্যবসা শুরু করার আগে কাগজপত্র সংগ্রহ করে নিন। এখন আর ট্রেড লাইসেন্স করতে আগের মতো ভোগান্তি নেই। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে এপ্লাই করলেই অল্পদিনের মধ্যে ভেরিফিকেশন করে আপনার লাইসেন্স দিয়ে দিবে। 

উপযুক্ত স্থানে অফিস দিন

কোনো বানিজ্যিক ভবনে অফিস দিলে তা যতটা পপুলার ও বিশ্বস্ত হয় তা আবাসিক এলাকার আবাসিক ভবনে কখনই হয় না। আবার সবার পক্ষে ভালো জায়গার বানিজ্যিক ভবনের খরচ বহন করে ব্যবসা করাও সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে আপনি কোনো পরিচিত প্রতিষ্ঠানের পাশে অফিস দিতে পারেন। যেমন আপনি যদি কাউকে বলেন, আমার অফিস মোহম্মদপুর শিয়া মসজিদ এর পাশে তাহলে এই এরিয়ায় থাকা যেকেউ মুহুর্তের মধ্যেই চিনে যাবে। তবে অনেকে এখন অনলাইন কুরিয়ার ব্যবসা আবসিক ভবন থেকেই পরিচালনা করে থাকেন। এতে তেমন একটা সমস্যা হয় না কারন এই অনলাইন কুরিয়ার সার্ভিসের সেবাও সীমিত পরিসরে দেয়া হয়। কিন্তু আপনি যদি দেশব্যাপি সার্ভিস দেয়ার কথা ভাবেন তবে অবশ্যই আপনাকে উপযুক্ত কোনো এলাকা নির্বাচন করতে হবে। 

 আস্থাভাজন কর্মচারী নিয়োগ

কুরিয়ার ব্যবসার সফলতা অনেকটা বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে। মানুষ যেমন তাদের অনেক দামী দামী জিনিসগুলো আপনার প্রতিষ্ঠানের কাছে দিয়ে যাবে, আপনাকেও তেমনি সেগুলো সচেতনতার সাথে গন্তব্যে পাঠাতে হবে। কিন্তু আপনার কর্মচারী যদি হয় অদক্ষ, অসৎ হয় তাহলে আপনি সফলতার মুখ তো দেখবেন-ই না উলটো আপনাকে লোকসানের ভার বইতে হবে। এজন্যে যখন কর্মী নিয়োগ করবেন তখন যারা দক্ষ, সৎ তাদের নিয়োগ দিতে হবে। অনেক অনলাইন কুরিয়ার কেবল অদক্ষ ও অসৎ ডেলিভারি ম্যানের কারনে ব্যবসায় ব্যর্থ হয়েছে।

মালবাহী পরিবহন নির্ধারণ করুন

আপনি যেহেতু কুরিয়ার ব্যবসা করবেন সূতরাং আপনার কুরিয়ার করার গাড়ীতো লাগবেই। সেটা হউক ট্রাক, পিক আপ ভ্যান, মোটর সাইকেল ইত্যাদি। কুরিয়ার গাড়ী কেনার সময় অবশ্যই কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। যেমনঃ 

  • গাড়ীটির লাইসেন্স, ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকতে হবে।
  • গাড়ীর ভেতরের স্পেস বেশি হওয়া ভালো, তাতে বেশি বেশি পার্সেল রাখা যাবে। 
  • পুরাতন, দুর্বল গাড়ি কেনা ঠিক নয় এতে পার্সেলে সমস্যা হতে পারে।
  • গাড়ির স্প্রিং কোয়ালিটি ভালো হওয়া যাতে রাস্তার ঝাকুনিতে পার্সেল নষ্ট না হয়।

বিভিন্ন অফার, ক্যাম্পেইন রান করা

আপনার গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি করতে বিভিন্ন ধরনের অফার দিন। অফারগুলো অনলাইনে এড দিয়ে দিতে পারেন। অনলাইনের প্রচারনা অনেক বেশি কার্যকর। কাস্টমার রিভিউ সংগ্রহ করেন। সেগুলো পেইজে পোস্ট করুন। 

পরিশেষে

আমাদের দেশে শিক্ষিতদের জন্যে পর্যাপ্ত জব নেই। তাই উদ্যোক্তা হয়ে জীবনে সফলতা পেতে পারেন। কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসা করে এখন আমাদের দেশে সফল হওয়া সম্ভব তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে কৌশলী হতে হবে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের একটি প্রতিষ্ঠান দাড় করাতে হবে। 

 

We will be happy to hear your oughts

Leave a reply

You cannot copy content of this page

Monster Bangla
Logo
Compare items
  • Total (0)
Compare
Shopping cart