অশ্বগন্ধা খাওয়ার নিয়ম ও উপকারিতা

অশ্বগন্ধা আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্রের অন্যতম ভেষজ হিসেবে বহু বছর থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। অশ্বগন্ধাকে প্রাচীন ভারতের অত্যশ্চয্য বলা হতো কারন তখন বর্তমান সময়ের মতো এত উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না ফলে এসব ভেষজ দিয়েই হতো জটিল জটিল রোগের চিকিৎসা। মূলত মানসিক রোগসমূহের চিকিৎসায় এটি তখন বেশি ব্যবহৃত হতো । এছাড়া অশ্বগন্ধার বহুবিদ উপকার রয়েছে যা আমরা উল্লেখ করব। কালক্রমে মানুষ এসব ভেষজের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার কারনে কিন্তু এখনো ভারটিয় উপমহাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্রে এই ভেষজের গবেষনা ও চিকিৎসা অব্যাহত আছে। আপনি হয়ত অশ্বগন্ধা গাছটি দেখে থাকবেন তবে গাছটি সম্পর্কে না জানার কারনে চিনতে পারছেন না। তবে আমাদের আজকের আর্টিকেলটি পড়ার পরে আপনারা অশ্বগন্ধা গাছ চেনার উপায়? অশ্বগন্ধার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। 

অশ্বগন্ধা কি?

অশ্বগন্ধা এক ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ যা প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে । এই গাছ থেকে ঘোড়ার মুত্রের মতো এক ধরনের গন্ধ আসার কারনে এর নাম অশ্বগন্ধা রাখা হয়। অশ্ব মানে ঘোড়া। অশ্বগন্ধার বৈজ্ঞানিক নাম Withania somnifera. 

অশ্বগন্ধা গাছে ফুল, ফল, চাল, ডাল, পাতা হয় যার সবগুলোই বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে খাওয়া হয়। 

অশ্বগন্ধার উপাদান

অশ্বগন্ধায় রয়েছে মানবদেহের জন্যে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন রকমের ভেষজ উপাদান। যেমনঃ ট্যানিনস, স্যাপোনিনস, এলকালয়েড, স্টেরয়ডাল ও ল্যাক্টোনস। এই ভেষজ উপাদান বাত, প্রদাহ, ক্যান্সার, মানসিক রোগসহ বিভিন্ন রকমের রোগে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এতে রয়েছে যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধি করার উপাদান। উইথানোন, উইথাফেরিন ও উইথানোলাইডের মতো বায়ো এক্টিভ যৌগগুলোও পাওয়া যায় অশ্বগন্ধায়।

অশ্বগন্ধা গাছ চেনার উপায়

অশ্বগন্ধা গাছ দুই রকমের হয় । সাধারন অশ্বগন্ধা যেটি আমরা ভেষজ হিসেবে গ্রহন করি এটি বানিজ্যিকভাবে ভারতে চাষও হয়। এছাড়া চীন ও নেপালেও এটি পাওয়া যায়। আরেক প্রকার অশ্বগন্ধা হলো জঙ্গলী অশ্বগন্ধা যেটি বন জঙ্গলে জন্মে। এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করবেন সাধারন অশ্বগন্ধার পাতা মোটা হয় এবং এর  ফলগুলো হয় লাল চেরীর মতো। 

অশ্বগন্ধার উপকারিতা কি?

মানসিক চাপ কমাতে

অশ্বগন্ধা মানুষের স্নায়ুর অতিরিক্ত সক্রিয়তা কমায়, ফলে মানসিক চাপ কমে যায়। এতে ভালো ঘুম হয়। অনিদ্রার ঔষধ হিসেবে এক অশ্বগন্ধা খেতে দেওয়া হতো। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অতিরিক্ত ব্যস্ততার কারনে মস্তিষ্কের স্নায়ুতে একটা দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখা দেয়। এতে মানুষ অনিদ্রা, খিটখিটে মেজাজ, ভুলে যাওয়ার সমস্যায় ভুগে। তখন তাদের ছুটতে হয় চিকিৎসকের কাছে, কিন্তু ব্যয়বহুল চিকিৎসার পরিবর্তে আপনি এই প্রাকৃতিক উপাদানটি সেবন করে দেখতে পারেন । আশা করি আপনার সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

যৌনক্ষমতা বাড়ায়

যৌন সমস্যা আমাদের দেশের বর্তমান সময়ের খুবই সাধারন একটি সমস্যা। সম্ভবত এমন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ পাওয়া কঠিন যিনি কখনও যৌন সমস্যায় ভুগেননি। অনেকে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক টাকা খরচ করে বিভিন্ন প্রতিকার নিলেও কিছুদিন ঠিক থেকে আবার সমস্যা দেখা দেয়। এই ক্ষেত্রে আপনি অশ্বগন্ধা সেবন করে দেখতে পারেন। কারন এটি যৌন হরমোন টেস্টোস্টেরন, প্রোজেস্টেরন এর পরিমান বাড়িয়ে যৌন সমস্যা কমায় ও যৌন সক্ষমতা বাড়ায়।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে

শাস্ত্রমতে, অশ্বগন্ধা দেহের স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। এর বিশেষ উপাদান শরীরের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে থাকে। কোলেস্টেরল কম থাকায় হার্টে ব্লক হওয়ার আশংকা কম থাকে। হার্টের ব্লক থেকেই মানুষের হার্ট এটাক হয় যাতে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। নিয়মিত অশ্বগন্ধা সেবনে এসব সমস্যা হওয়ার ঝুকি অনেকটাই কমে যায়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে

এ গাছের পাতার রসে এক ধরনের এন্টি ডায়াবেটিক উপাদান রয়েছে যা মানুষের সুগার লেভেল কমায়। ফলে ডায়াবেটিস রুগীরাও অশ্বগন্ধা থেকে উপকার পেতে পারে। যারা ইনসুলিন নিতে নিতে এখন সেটাও আর কাজ করে না , তারা এই প্রাকৃতিক উপাদানটি সেবন করে দেখুন , আশা করি ভালো ফলাফল পাবেন। 

থাইরয়েডের সমস্যায়

থাইরয়েডের রুগী এখন দেশের হাসপাতালগুলোতে খুব এভেইলেবল হয়ে গেছে। মূলত থাইরয়েড গ্রন্থির থাইরক্সিন নামক হরমোনের অতিমাত্রা(হাইপার থাইরয়েড) বা স্বল্পমাত্রা(হাইপো থাইরয়েড) থাকার কারনে এই গ্রন্থিতে রোগ হয়। এটি এক প্রকার হরমোনাল ব্যাধি। প্রাথমিক অবস্থায় খুব সমস্যা না করলেও এটি এক সময় জটিল আকার ধারন করে শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অর্গান যেমন মস্তিষ্ক, হার্ট, লিভার এর ক্ষতি সাধন করে। তাই থাইরয়েডের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। অশ্বগন্ধা থাইরয়েড সমস্যার একটি আদর্শ সমাধান । নিয়ম করে এই ভেষজ সেবনে থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোন ব্যালেন্স থাকে। 

ত্বক ও চুলের যত্নে

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে অশ্বগন্ধা ত্বক ও চুলের যত্নে ব্যবহার হয়। যাদের চুল পড়া সমস্যা আছে তাদের অশ্বগন্ধা ব্যবহারে সমস্যা কমে আসে। এছাড়া এটি ত্বকের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে । 

কম বয়সে যাদের ত্বকে বয়সের চাপ চলে এসেছে তারা এটি চেষ্টা করে দেখতে পারেন। 

এক নজরে অস্বগন্ধার আরো কিছু উপকারিতা 

১. অশ্বগন্ধা রক্তে কর্টিসল হরমোন কমাতে সাহায্য করে। 

২. কোনো এক্সিডেন্টে প্রাপ্ত আঘাত জনিত প্রদাহ বা ব্যথা কমায় অশ্বগন্ধা।

৩. দীর্ঘস্থায়ী জ্বর নিরাময় করতে পারব অশ্বগন্ধা। এর জন্যে অশ্বগন্ধা গুড়োর সাথে মধু মিশিয়ে খেতে হয়।

৪. অন্ত্রের কৃমির উপদ্রব কমায়। 

৫.  মাথার খুশকি দূর করে অশ্বগন্ধা শ্যাম্পু।

৬. স্ট্রেস লেভেল কমায়।

৭. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

অশ্বগন্ধা খাওয়ার নিয়ম

অশ্বগন্ধা অনেক উপকার করে এটা আমরা বুঝতে পেরেছি কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা, কিভাবে অশ্বগন্ধা খেতে হয়?তাই এখন আলোচনা করব অশ্বগন্ধা খাওয়ার নিয়ম সম্পর্কে?

এখন বাজারে সহজেই অশ্বগন্ধা গুড়া ও ট্যাবলেট দুই ফরমেটেই পাওয়া যায়। আপনি চাইলে ইচ্ছেমতো যেকোনোটা নিতে পারেন। বিভিন্ন হার্বাল ও আয়ুর্বেদিক কোম্পানিগুলো এসব ঔষধ বাজারে নিয়ে আসায় সাধারণ মানুষের জন্যে সহজ হয়েছে।  যাই হউক অশ্বগন্ধার ট্যাবলেট একটি করে প্রতিদিন রাতে খাওয়া উচিৎ।  

 অশ্বগন্ধার গুড়া হালকা গরম দুধের সাথে মিক্সড করে খাওয়া যায়। এক গ্লাস দুধের সাথে এক চামুচ গুড়া মিশিয়ে খেতে পারেন। বাড়তি উপকার পেত এর সাথে মধু মিশিয়ে খেতে পারেন। 

অশ্বগন্ধার মূল সিদ্ধ করে খেতে পারেন। অশ্বগন্ধার সিরাপও বাজারে পাওয়া যায়। অশ্বগন্ধার সিরাপ হার্টের জন্যে বেশ উপকারী। দিনে দুইবার করে এই সিরাপ খেতে পারেন।

অশ্বগন্ধার পাশ্বপ্রতিক্রিয়া 

বরাবরের মত অন্যসব ভেষজ উপাদানের মতোই অশ্বগন্ধার কিছু পাশ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে। নিচে কয়েকটি উল্লেখ করা হলোঃ

১. দীর্ঘদিন অশ্বগন্ধা সেবনে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার প্রমান পাওয়া গেছে।

২. বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের অশ্বগন্ধা সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে কারন এতে অসময়ে গর্ভপাত হবার সম্ভাবনা থাকে। 

৩. অশ্বগন্ধা রক্তের ঘনত্ব কমায়। তাই ডেঙ্গু জ্বর কিংবা কোনোরকম অস্ত্রপাচারকালে এটি সেবন বন্ধ রাখতে হবে।

৪. যেসব মায়েরা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান তাদের এটি সেবনে সতর্ক হতে হবে। 

৫. অনেকেরই নিয়মিত শর্করা কমানোর ঔষধ সেবন করতে হয় তাদের অশ্বগন্ধা না খাওয়াই ভালো কারন এতে শর্করার পরিমান অতিরিক্ত কমে যেতে পারে। 

৬. যাদের কোনো কো মর্বিডিটি আছে তারা এটি সেবনের পূর্বে আপনার চিকিৎসকের সাথে অবশ্যই পরামর্শ করে নিবেন।

পরিশেষে 

এই আর্টিকেলটি পড়ে থাকলে আপনাকে মানতেই হবে অশ্বগন্ধা অনেক উপকারী।  তবে সবকিছুর মতোই এটি সেবনেও কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। তাই আপনাকে এর পরিপূর্ণ উপকার পেতে হলে আগে বিস্তারিত জেনে এর পরে সেবন করতে হবে। নাহয় উপকার পেতে গিয়ে আপনি ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারেন। সবচেয়ে ভালো হলো আপনি চিকিৎসকের মতামত নিয়ে এটি সেবন করা। 

4728dbbc5c6763f37c33f5ebb100ad9e?s=150&d=mm&r=g

Tanvir Brain

 themarketerbd@gmail.com  https://www.monsterbangla.com

We will be happy to hear your oughts

Leave a reply

Monster Bangla
Logo
Compare items
  • Total (0)
Compare
Shopping cart